২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই আন্দোলনের সময় অনেকেই গণতন্ত্র ও দেশের স্বার্থে স্বজনহারা হন। এ আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য শহীদদের মধ্যে কয়েকজন হলেন:
আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম, মীর মাহফুজুর রহমান (মুগ্ধ), ফারহান ফাইয়াজ ইত্যাদি।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী, ৩ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা ৮৩৬।
আবু সাঈদ (২০০১ – ১৬ জুলাই ২০২৪) ছিলেন একজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সক্রিয়কর্মী। তিনি এই জুলাই আন্দোলনের রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমন্বয়ক ছিলেন। ১৬ই জুলাই আন্দোলন চলাকালে একজন পুলিশ সদস্যের গুলিতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহিদ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

আবু সাঈদ ২০০১ সালে রংপুরের জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। আবু সাঈদ ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। তিনি স্থানীয় জাফর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপরে স্থানীয় খালাশপীর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাশ করেন। এরপর তিনি ২০১৮ সালে রংপুর সরকারি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেন। পরে তিনি ২০২০ সালে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। তিনি তার বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

শহীদ ওয়াসিম আকরাম হলেন বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনে (জুলাই আন্দোলন) চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ, যিনি ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন; তিনি চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের সদস্য ছিলেন এবং তার আত্মত্যাগ এই আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়, যার স্মরণে একটি ফ্লাইওভারের নামকরণ করা হয়েছে ।

শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ছিলেন একজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। তিনি একজন মুক্তপেশাজীবী বা ফ্রিল্যান্সার হিসেবেও কাজ করতেন। আন্দোলনের সময় খাবার পানি এবং বিস্কুট বিতরণ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মুগ্ধর মৃত্যু কোটা সংস্কার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

মুগ্ধর বাবার নাম মীর মোস্তাফিজুর রহমান, মায়ের নাম শাহানা চৌধুরী। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রামরাইল। তিন ভাইয়ের মধ্যে মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ও মুগ্ধ ছিলেন যমজ।
মুগ্ধ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে এমবিএ করছিলেন। মৃত্যুর সময় তার গলায় বিইউপি আইডি কার্ডটি রক্তমাখা অবস্থায় ছিল।
তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফাইভারে এক হাজারের বেশি কাজ সম্পন্ন করেন। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পাশাপাশি তিনি একজন ভ্রমণপিপাসু, ফুটবলার, এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের সদস্য ছিলেন।
ফাইভার ৩১ জুলাই ২০২৪ তারিখে এক ভেরিফাইড অফিশিয়াল পোস্টে জানায়, মুগ্ধ ছিলেন একজন প্রতিভাবান মার্কেটার। বিশেষ করে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও) এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকায় সংঘর্ষ চলাকালে মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর তার যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ ফেসবুকে একটি ছোট ভিডিও পোস্ট করলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফাইভার তার মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় শোক প্রকাশ করে।
‘পানি লাগবে পানি’’
‘পানি লাগবে পানি’’ ছিলো মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ-এর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ধারণকৃত একটি ভাইরাল ভিডিওর বাক্য, যা আন্দোলনকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে মীর মুগ্ধকে একটি ভিডিওতে পানির কেস হাতে নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে পানি বিতরণ করতে দেখা যায়, যেখানে তিনি একাধিকবার বলেন—“পানি লাগবে কারো, পানি, পানি?” প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি আহত বা ক্লান্ত শিক্ষার্থীদের পাশে গিয়ে বারবার পানি দিতে এগিয়ে যান এবং কিছুক্ষণ পর গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে "পানি লাগবে পানি" বাক্যটি আন্দোলনের প্রতীকী স্লোগানে পরিণত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আকারে ব্যবহৃত হয়।
শহীদ ফারহান ফাইয়াজ ছিলেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী, জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৬, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে। জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে ১৮ জুলাই ২০২৪ রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই তরুণ আন্দোলনে নেমে আর ঘরে ফিরতে পারেননি। তার মৃত্যু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয় এবং তা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ পরিবার হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেছেন। সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনদের কাছে ফারহান ফাইয়াজ আজ নতুন প্রজন্মের এক কিংবদন্তি ও শহীদ হিসেবে স্মরণীয়।

Read more